নিদারুণ বিস্ময়ের সাথে ঘাতক পুলিশের ছোড়া গুলি বুকে নিয়ে আবু সাইদ যখন মাটিতে লুটিয়ে পরলেন ঠিক তখনই বাংলাদেশের সাধারণ আওয়ামের মনোজগতে আসল এক বিশাল পরিবর্তন। যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী শোষণে নিষ্পেষিত সাধারণ আওয়াম যেন বুঝতে পারলো অনেক হয়েছে, আর না। আচমকা সৃষ্ট হওয়া এই বিদ্রোহী মনোভাব দাবানলের মত ছড়িয়ে পরলো পুরো দেশে। যাতে আঙ্গার হয়ে পালাতে বাধ্য হলেন তথাকথিত 'আয়রন লেডি' শেখ হাসিনা।
আগষ্টের পাঁচ তারিখ, অভ্যুত্থানের নায়কদের মতে জুলাইয়ের ছত্রিশ ; বিজয় কেতন উড়বার সাথে সাথে আকা হয়েছিলো অনেক স্বপ্ন। কয়েক মাসের ব্যবধানে যার অনেকগুলোই ধাক্কা খেয়েছে। অভ্যুত্থান থেকে শত ক্রোশ দুরে অবস্থান করা সংস্থাগুলো স্বভাবতই ব্যর্থ হয়েছে নব জাগরণের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া চেতনার ঠাহর পেতে। তা নিয়ে আমার আফসোস নেই। স্বৈরাচারের ছায়া তলে আশ্রয় নিয়ে নিজেকে ক্ষমতার অংশ ভেবে আত্মশ্লাঘায় ভোগা এ শ্রেণীর যে নূন্যতম অনুধাবন শক্তি নেই তা সম্পর্কে আগে থেকেই জ্ঞাত ছিলাম। কিন্তু আশাহত হয়েছি তখনই যখন দেখেছি সংস্থার প্রধানের পদে পরিবর্তন আসলেও আচরণে সেই সাবেকী ধাচ রয়ে গিয়েছে বহাল তবিয়তে। বিশেষ করে উল্লেখ করবো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তথা বিসিবির কথা।
অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে পরিবর্তন এসেছিলো বিসিবি প্রধান পদে। পাপনশাহির শোষনামল থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ফের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিবে এমনটাই ছিলো প্রত্যাশা। তাতে প্রথমবার ধাক্কা লাগে যখন অভ্যুত্থানের ঠিক পরপর অনুষ্ঠিত পাকিস্তান সিরিজে আমরা সাকিবের নাম দেখি। সেটি আরো প্রকট রূপ ধারন করে যখন আমরা দেখতে পাই বিসিবির পদস্থ কর্তারা সাকিবকে নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে বয়ান রাখছেন তখন।
প্রথম কথা হচ্ছে কোনো খেলোয়াড় যখন অবসরের আগেই রাজনীতিতে জড়িয়ে যান তখন তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেন। একজন সাংসদ একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড় প্রতিনিধিত্ব করেন পুরো জাতীর। ত, কেউ যখন যেচে পুরো জাতীর বদলে একটি নির্দিষ্ট মতবাদ বা গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন তখন তার পক্ষে পুরো জাতীর প্রতিনিধিত্ব করা কিভাবে সম্ভব? এটি নিয়ে আমরা চাইলেও প্রশ্ন করতে পারিনি কেননা সে পরিবেশ তখন ছিলো না। কিন্তু তারপরেও এ দৃশ্য দেখাটা কি প্রত্যাশিত ছিলো?
সাকিব কি নেহায়েতই একজন সাংসদ? যার প্রতি আমরা অহেতুক রূঢ় আচরণ করছি? এ প্রশ্নও উঠেছে বৈকি। বান্দা ময়দানে যতটা দক্ষতার সাথে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানকে খাবি খাইয়েছেন তারচেয়ে দ্বিগুণ দক্ষতায় করে গিয়েছেন একের পর এক অপকর্ম। শেয়ার কারসাজি, স্বর্ণ চোরাচালান, জুয়ারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সখ্যতা, ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব পাওয়ার তথ্য গোপন সহ অসংখ্য অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আশ্চর্য শোনালেও সত্য এ অভিযোগগুলো একজন ক্রিকেটারের নামে যিনি একটা লম্বা সময় জাতীয় দলের অধিনায়কত্বও করেছেন। কোনো সভ্য দেশে এর যেকোনো একটি অভিযোগই যথেষ্ট ছিলো যে কারো ক্যারিয়ারে যতিচিহ্ন টেনে দিতে।
এসবের পরও সাকিব ছিলেন বহাল তবিয়তে। যুগের বেশি সময় ধরে দুর্নীতিকে নীতিজ্ঞান করা ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদগুলোতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া আওয়ামের নজরে সাকিব ছিলেন 'আরো একটি উদাহরণ'। সেটি যে ইতিবাচক নয় তা বলাই বাহুল্য। এবং এ নিয়ে সাকিবেরও যে কোনো হেলদোল ছিলো না তা ত আমরা দেখেছিই।
তাহলে বিপত্তিটা বাঁধলো কোথায়? আপনি যদি আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী বা সমর্থক হয়ে থাকেন তাহলে রিকশার পাদানিতে ঝুলে থাকা অর্ধমৃত নাফিজের রক্তাক্ত দেহ ভুলে যাবার কথা না। সভ্যতার যুগে বর্বরতার নিকৃষ্টতম দৃশ্য যখন ঢাকার বুকে মঞ্চস্থ হচ্ছে তখন সাকিব আনন্দে সময় কাটাচ্ছেন কানাডায়। সেটির জানান দিলেন সদম্ভে। আপনার ভেতরে নূন্যতম মানবিকতা থাকলে ছবি দুটো পাশাপাশি রেখে দেখুন। তারপর বলুন কেমন লাগছে। অনেকে বলতে চেয়েছেন এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল মাত্র। আপনি যদি সাকিবকে চিনে থাকেন তাহলে এটি বিশ্বাস করা খুবই কষ্টসাধ্য। প্রিয় নেত্রীকে পালাতে না হলে এ ছবি দেখিয়ে দলের অভ্যন্তরে সাকিব যে বাহবা কুড়াতেন সে বিষয়ে আমি অন্তত নিশ্চিত।
তর্কের খাতিরে ধরে নি সাকিব নিষ্পাপ, নির্বোধ। যিনি ঘটনাচক্রে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িয়ে গিয়েছেন। তবুও ত প্রশ্ন থেকে যায়। এমন ত না যে যুগের অধিক স্থায়ী শোষনামলে এই প্রথম আওয়ামী লীগ এমন বর্বরোচিত আচরণ করেছে। ক্ষমতা কব্জায় নেয়া দুই মাসের মাথাতেই সংগঠিত পিলখানা হত্যাকান্ড, শাপলা গণহত্যা, আল্লামা সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে ঘটানো হত্যাযজ্ঞ; পাপের তালিকা ত বেশ বড়। এর সাথে অগণিত গুম খুন ত রয়েছেই। হ্যা, একটা সময়ের পর এগুলা নিয়ে প্রকাশ্যে হয়ত তেমন উচ্চবাচ্য করা যায়নি কিন্তু এ ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানেন না এমন কেউ কি আছেন? অপরাপর অপরাধগুলোর দিক এ মুহূর্তে আলোকপাত করছি না। এ সব কিছু জানার পরেও কেউ যখন যেচে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করেন তখন ত এটিই প্রমাণ হয় যে এসকল অপকর্মে তার সায় রয়েছে। নতুবা তিনি এ যজ্ঞে যোগ দিবেন কেন?
যেটি হিসাবের বাইরে ছিলো তা হচ্ছে এতকিছু করে পার পেয়ে যাওয়া লীগের পতন। এবং এখানেই গোলমালটা। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন দলের বিপক্ষে সাকিবের অবস্থান নেয়ার সুযোগ ছিলো না। কেন? তাহলে তার সাংসদ পদ চলে যেত। এ বয়ানও ত সাকিবের চরিত্রের নেতিবাচক দিকই তুলে ধরে। পদের লোভে যিনি নির্বিচার হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করতে পারেন তিনি যদি সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত না-ও হন তবুও ত দায় এড়াতে পারেন না। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। সাধারণত সন্তানরা পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করলেও সাকিবের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। পুত্রের কর্মে অনুপ্রাণিত হয়েই কি-না কে জানে সাকিবের পিতা নেতৃত্ব দিয়েছেন মাগুরা শহীদ *** হত্যাকাণ্ডে। পিতার কর্মের দায় যদিও সরাসরি পুত্রের উপর বর্তায় না কিন্তু পিতা পুত্রের কর্মের ফিরিস্তিতে একটা বিষয় স্পষ্ট; তারা ক্ষমা লাভের অযোগ্য।
বিসিবি প্রধানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিলো তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা বুঝবেন। যে পতাকা পরিণত হয়েছে পুরো লালে, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাবেন। আসন্ন বিপিএল এর মাস্কটে তার ছাপ রেখে তিনি সে বার্তা দেয়া চেষ্টা করছেন বলে মনে হলেও আমাদের ভ্রম ভাঙে তখনই যখন তিনি মাস্কট উন্মোচন অনুষ্ঠানে বলেন যে তিনি এখনো চান যে সাকিব জাতীয় দলের হয়ে খেলুক! পরস্পরবিরোধী এ কর্ম কি তার অযোগ্যতা নাকি আওয়ামকে আহাম্মক ঠাউরে কর মশকরা তা বলা কঠিন। তবে, এসকল বয়ান আমাদের আশাহত করে, ক্ষুব্ধ করে।
প্রধান কর্তার এহেন আচরণের ছাপ আমরা দেখতে পাই বাকিদের মাঝেও। নাজমুল হাসান শান্ত ত রীতিমতো জুলাই অভ্যুত্থানের সৈনিকদের এক রকম কটাক্ষই করেছেন বলা চলে। এসব কিছু করেও তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন। কখনো নির্বাচক হান্নান শাহ ত কখনো আব্দুর রাজ্জাকও বয়ান রাখছেন সাকিবের পক্ষে। এত ত্যাগের পরেও যদি একজন খুনির দোসরের প্রতি আমাদের এই মায়াকান্না শহীদদের আত্মার প্রতি, যুদ্ধাহতদের প্রতি রীতিমতো নিষ্ঠুর পরিহাস। তারা যেন বলতে চাইছেন, তোমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলে তা কেবলই ভ্রম; আমরা সেভাবেই চলব, চালাবো যেভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের আগে চলত।
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যিনি রয়েছেন তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানে। শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী জুলুমের চিহ্ন। স্বভাবতই তাই ক্রীড়া উপদেষ্টার কাছে আমাদের প্রত্যাশা আসমানসম। কিন্তু তার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা যখন এরূপ আচরণ করে তখন আমাদের মনে নেতিবাচক প্রশ্নের জন্ম নেয়। আমরা আশাহত হয়ে পরি। সংস্থা গুলো যদি আপনাদের সাহায্য না করে, আমরা আপনাদের পাশে দাড়াবো। যেমন করে পাশে দাড়িয়েছিলাম জুলাই অভ্যুত্থানে। শক্ত হাতে এসকল আচরণে লাগাম টানুন প্রিয় উপদেষ্টা। নিজের হাতে তৈরি স্বপ্নের গলাটিপে ধরার দায় নেয়ার নিশ্চয় কোনো ইচ্ছে নেই আপনার।
সময়ের স্রোতে ক্রিকেট হয়ে উঠেছে আপামর জনসাধারণের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেটি অনুধাবন করতে পেরে পতীত স্বৈরাচার তাকে কাজে লাগিয়েছিলো নিজের অপকর্ম থেকে আওয়ামের নজর সড়িয়ে রাখতে। আমরা ক্রিকেটকে পুনরায় সে রূপে দেখতে চাই না। আমরা চাই না জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা রাজনৈতিক দলের কর্মীর মত আচরণ করুন। আমরা চাই না তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ভুলে ভোটের ক্যানাভাসারে পরিনত হন। শত শত খেলোয়াড়দের মাঝে থেকে জাতীয় দলের হয়ে খেলার গৌরব অর্জন করতে পারেন হাতেগোনা কয়েকজন। তাদের উপর অর্পণ করা হয় বিশ্বমঞ্চে জাতীকে প্রতিনিধিত্ব করার পবিত্র দায়িত্ব। সেটা যারা অনুধাবনে অক্ষম তাদের আমরা জাতীয় দলের হয়ে খেলতে দেখতে চাই না।
এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তা অস্থির সময়ের চিত্র বলে আমরা ধরে নিতে চাই। কিন্তু সময় ত থেমে থাকে না, থাকবেও না। ক্রমশ গনবিরোধী একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে থাকা বিসিবির লাগাম টেনে ধরতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে আসিফ মাহমুদকে যদি বিদায় নিতে হয় সেটি হবে চরম হতাশার। এমন দিন না আসুক সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।
আহনাফ নাসিফ
আহনাফ নাসিফ বাংলাদেশের ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট লেখালেখির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। পূর্বে কাজ করেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক নিউজ পোর্টালের ক্রীড়া-সম্পাদক হিসেবে। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছে জাতীয়তাবাদী ওয়েবম্যাগ ‘আন্তঃএশিয়া’র সম্পাদক হিসেবে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ‘রিয়াল মাদ্রিদ’ দেশের প্রথম ফুটবল বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গ্রন্থ।
আরো পড়ুন